কেন পড়বো টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ??

কেন পড়বো টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ??

Textile Engineering

ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আন্ডাররেটেড একটি সাবজেক্ট হলো টেক্সটাইল ইঞ্জিনয়ারিং বা বাংলায় যাকে আমরা বস্ত্র প্রকৌশল নামে জানি। এই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর নাম শুনলেই প্রথমে আমাদের মাথায় আসে কাপড় কিংবা সুতা নিয়ে কাটাকাটির কথা। অনেকে আবার ভাবে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে গার্মেন্টসের কাজ ছাড়া কোনো কাজ পাওয়া যায় না। কাপড় সেলাই থেকে শুরু করে কাপড়ে রঙ দেওয়া এমন অনেক ভ্রান্ত ধারণাও ছড়িয়ে আছে এই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে।

 

তবে সত্যি কথা বলতে ইঞ্জিনিয়ারিং এর বিষয়গুলোর মধ্যে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, যেখানে আপনি নিজের মনের মতো করে কোনো কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীই এই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে আগ্রহী হলেও আমাদের প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা তাদের আগ্রহকে দমিয়ে দিচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে সেখানে এই দেশে সবচেয়ে কম মূল্যায়ন করা হয় এই বিষয়টিকে।

 

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বা বস্ত্র প্রকৌশল বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সেক্টর হলেও বাংলাদেশের তরুণ সমাজের টেক্সটাইল সেক্টরের ব্যাপারে সঠিক ধারনা নেই। এতে এমন বিষয় নিয়েও কাজ করা হয় যা শুনলে হয়তো অনেকে প্রথমে অবাকও হবে। তন্তু থেকে কাপড় বানানোর জন্য সেই উপযোগী সুতা কিভাবে উৎপাদন করা যা, একটি ফেব্রিককে কীভাবে আরও আরামদায়ক করা যায়, কেমিকেল ব্যবহার, ডায়েস, টেক্সটাইলস ফ্যাক্টরি সমুহে ব্যবহৃত মেশিন মেইন্টেনস এবং নতুন নতুন মেশিন এর ডিজাইনিং নিয়ে এই বিষয়ে পড়ানো হয়।

 

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথমে ৪টি ব্যাসিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হয়। 

১. ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিংঃ একটি পোশাকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুতা। কীভাবে একটি ভালো ও উন্নতমানের সুতা প্রসেস করে আরামদায়ক একটি পোশাক তৈরি করা যায় কিংবা সুতাটাকে কতটা সহনীয় করা যায় তা নিয়ে এই শাখায় আলোচনা করা হয়।

২. ফেব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিংঃ সুতার গুণগত মান চেক করা শেষ হলে বা ভালো মানের একটি সুতার যাচাই বাছাই শেষ হলে সেই সুতা দিয়ে আরও কিছু জটিল ধাপ শেষ করে একটি মানসম্মত কাপড় তৈরি করা হয় এই ধাপে। 

৩. ওয়েট প্রসেসিংঃ এই ধাপটি মূলত রাসায়নিক প্রযুক্তি নির্ভর। অনেকে একে আবার টেক্সটাইল কেমিস্ট্রিও বলে থাকে। কেননা এই ধাপে একটি কাপড়কে রঙিন করা অর্থাৎ কাপড়ে রঙ দেওয়ার কাজ করা হয় যা খুবই সাবধানতার সাথে করতে হয়। কেননা কাপড়ে কোয়ালিটিফুল রঙ দেওয়া, সেই রঙ্যের টেকসই, কাপড়টা সেই রঙ সহ্য করতে পারছে কি না কিংবা কাপড়ে রংয়ের স্থায়িত্বতা নিয়ে এই ধাপে গবেষণা করা হয়।

৪. গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিংঃ আমরা ভাবি একটি কাপড় কত সহজেই না আমাদের হাতে চলে আসছে। কিন্তু কাপড়টি এর উৎপাদন ধাপ থেকে শুরু করে আরও অনেক অনেক ধাপ শেষ করে সবশেষে আমাদের হাতে আসে। আর সবচেয়ে বেশি ধাপ অতিক্রম করতে হয় এই গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং শাখায়। এই শাখায় স্যাম্পলিং, ফেব্রিক স্প্রেডিং, কাটিং, সুইং, ফেব্রিক ওয়াশিং এবং ফিনিশিং ধাপ শেষ করে কাপড়টি আমাদের হাতে আসে এবং সবশেষে তা বাজারজাত করা হয়।

 

টেক্সটাইলের এই বেসিক জিনিসগুলো ছাড়াও আরও অনেক বিষয়ের সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং প্রসেস।

যেমন- ফ্যাশন ডিজাইনিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট, পলিমার ইঞ্জিনিয়ারিং, মেশিন ডিজাইনিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম, জিও টেক্সটাইল, মেডি টেক্স, ন্যানো টেক্সটাইল টেকনোলজি সহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে পুরো টেক্সটাইলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গবেষণা হয়ে থাকে। আসলে এটা সম্পূর্ণ ম্যানুফ্যাকচারিং নির্ভর একটা শাখা যেখানে একজন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারকে মেশিন সেট-আপ থেকে শুরু করে প্রসেস কন্ট্রোল,প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট, গিয়ার মেকানিক্স নিয়ে কাজ করতে হয়। 

 

বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সঠিক ধারণা রাখে না। কাপড় চোপড়ের আবার কিসের ইঞ্জিনিয়ারিং, সুতা কাটাও এখন ইঞ্জিনিয়ারিং এগুলো নিয়ে নানা ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ ছড়িয়ে আছে। যেখানে ওয়েট প্রসেসিং ইঞ্জিনিয়ারদের প্রথম সারির কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হতে হয়, যেখানে নাসার বিজ্ঞানীর মহাকাশে মানুষ পাঠাতে তাদের উপযোগী স্পেস স্যুট বানাতে শত শত টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিচ্ছে ন্যানো ফাইবার বা কার্বন ফাইবারের শিল্ড বানাতে সেখানে এখনও আমাদের দেশের মানুষ এর সম্পর্কে প্রায় জানেই না। 

 

বাংলাদেশে বুটেক্স, ডুয়েট, কুয়েটসহ বেশ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইলে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়ার বেশ ভালো সুবিধা রয়েছে। কুয়েট টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য সেরা একটি প্রতিষ্ঠান বলা যায়। আর চাইলে বাইরের দেশে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা করা যাবে। এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মার্চেনডাইজিং, বায়িং হাউস, রেশম বোর্ড , ডিজাইন,বোয়িং এন্ড কোয়ালিটি এসুয়েরেন্স কোম্পানি,বিসিক, বিজিএমইএ,ইপিজেড, বেপজা,ব্যাংক,কাস্টমস,তুলা উন্নয়ন বোর্ড, পাট গবেষনা কেন্দ্র সহ বিভিন্ন সেক্টরে আপনি ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারবেন।

 

টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম দিকে বেতন তুলনামূলক ভাবে কিছুটা কম হলেও দিন দিন বেতন বৃদ্ধি পায়। মেধা, পরিশ্রম, অধ্যবসায় দিয়ে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে অনেক ভালো স্যালারি পাওয়া যায়। তাছাড়া এই সেক্টরে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। 

Leave a Comment

error: Content is protected !!