কেন পড়বো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ?

কেন পড়বো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং

Civil Engineering

ইঞ্জিয়ারিং শাখার অন্যতম জনপ্রিয় এবং প্রাচীন একটি শাখা হচ্ছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বা বাংলায় যাকে আমরা পুরকৌশল বিধা হিসেবে জানি। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলে যে বিষয়গুলোর কথা আমাদের মাথায় আসে তার মধ্যে সিভিল ইঞ্জিয়ারিং একটি। দেশ ও দেশের বাইরে এর যেমন জনপ্রিয়তা রয়েছে তেমনি চাহিদাও প্রচুর। দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এ বিষয় নিয়ে যত উপরে সম্ভব ঠিক তত উপরেই যাওয়া যায়।

 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কে যদি আমরা সহজভাবে বুঝতে চাই তাহলে কন্সট্রাকশন বা আর্কিটেকচার বললেই অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়। এটি প্রকৌশল বিদ্যার এমন একটি শাখা যেখানে আমাদের জীবনব্যবস্থাকে সহজ ও আরও উন্নত করে তুলতে পরিবেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষতি না করেই একে নতুন কোনো স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা হয় কিংবা যেখানে মানবসৃষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ডিজাইন, কন্সট্রাকশন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কাজ করা হয়। সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা বড় বড় রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, সেতু, টানেল, বড় বড় ভবন, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট সহ এমন বিভিন্ন স্থাপনার নকশা করে থাকে এবং নির্মাণের কাজ করে। দালানকোঠা, রেলওয়ে, হাইওয়ে, ফ্লাইওভার, ব্রিজ থেকে শুরু করে স্টেডিয়াম, কৃত্তিম দ্বীপ ও আধুনিক যুগের বিস্ময়কর স্থাপনাগুলো ডিজাইন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরোটা কাজ একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এর দক্ষতা, সৃজনশীলতা, মেধা ও পরিচালনার সাথে শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রমের ফলাফল। 

 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ব্যাপ্তি অত্যন্ত বিশাল আর এই জন্যই একে “মাদার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং” বলা হয়। কখনো কখনো একে “রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ব্র‍্যাঞ্চ” নামেও ডাকা হয়। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের পুরো বিষয়টিকে মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ করে পড়ানো হয়। তবে প্রধানত ৪টি শাখা নিয়েই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মূল আলোচনা হয়ে থাকে। এছাড়াও আরও কয়েকটি শাখা আছে যেগুলোকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর মধ্যেই ধরা যায়। 

 

১. স্ট্রাকচারাল প্রকৌশলঃ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ, এর শক্তিমত্তা যাচাই ও এর স্থায়িত্বকাল ইত্যাদি নিয়ে মূলত এ শাখায় আলোচনা করা হয়। কোন স্থাপনা কোথায় স্থাপন করলে ভালো হবে, সেখানখার পরিবেশ সেই উপযোগী কি না কিংবা স্থাপনাটির ধারণ ক্ষমতা কেমন হবে সেগুলো নিয়ে এই শাখায় গবেষণা করা হয়।

 

২. কন্সট্রাকশন প্রকৌশলঃ এ শাখায় মূলত একজন ইঞ্জিনিয়ার তার কল্পনার স্থাপনাটিকে বাস্তবে রূপ দেয়। ব্রিজ, সেতু কিংবা কোনো স্থাপনার নকশা থেকে শুরু করে সেটি বাস্তবে কীভাবে নির্মাণ করা হবে তার পুরো প্রক্রিয়াটি স্কেচবুক থেকে একদম বাস্তবে হাজির হয়।

 

৩. পরিবহন প্রকৌশলঃ এই শাখায় মূলত যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করে থাকে। এখানে স্থলে বা জলের যাতায়াত পথ নির্মাণে কিংবা কোনো নকশা প্রণয়নে যেমন কাজ করা হয় একইভাবে আকাশপথেও কোনো যানবাহনের টার্মিনাল নির্মাণে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করে থাকে। নকশা প্ল্যানিং ডিজাইনিং থেকে শুরু করে বাস্তবে রূপদান সবই একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তার দক্ষ হাতে করে থাকে।

 

৪. পানি সম্পদ প্রকৌশলঃ নগরায়নে পানি ব্যবস্থা, পানি দূষণ রোধে পরিকল্পনা, বন্যা কিংবা নদী ভাঙ্গন মোকাবেলা, পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ পানি জাতীয় সব সমস্যা রোধে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর এই শাখাটি কাজ করে থাকে।

 

৫. পরিবেশ প্রকৌশলঃ ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ উন্নয়ন প্রকল্পে এই শাখা কাজ করে থাকে। পরিবেশের সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে কীভাবে উন্নত পরিবেশ গড়ে তোলা যায় কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য নতুন কোনো উদ্ভাবনী কাজ সবই এই শাখায় গবেষণা করা হয়ে থাকে।

 

৬. ভূমিকম্প প্রকৌশলঃ কোন মাটি কোন স্থাপনার উপযোগী কিংবা কোন উপাদান ভূমিকম্পে কতটা সহনীয় তাই এই শাখার মূল গবেষণার বিষয়। আমাদের দেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ এবং এর একেক জায়গার মাটি একেক রকম। নতুন স্থাপনা নির্মাণে সেই এলাকার মাটি এবং স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদান যেমন ইট, বালু, সিমেন্ট সেই অঞ্চলের জন্য উপযুক্ত কি না কিংবা ভূমিকম্পে কতটা সহনীয় তা নিয়ে আর্থকোয়াক ইঞ্জিনিয়ারিং এ আলোচনা হয়ে থাকে।

 

৭. নগর উন্নয়ন বা নকশা প্রকৌশলঃ এ শাখায় একটি শহর বা নগরের পরিকল্পির গঠন কাঠামো নিয়ে গবেষণা করা হয়ে থাকে। একটি শহর বা নগর কীভাবে গড়ে তোলা যায় কিংবা তাতে কি কি উপাদান থাকবে বা সামগ্রিক দিক মিলিয়ে একটি আদর্শ গ্রাম বা শহর কীভাবে নির্মাণ করা যায় তা নিয়েই এই বিষয়টিতে গবেষণা হয়। 

 

এছাড়াও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মানুষের উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে আর কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করা হয়ে থাকে যেমন- কোস্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং,, সাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি।

 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র‍্যাজুয়েশন করতে চাইলে উপরের সবগুলো শাখাতেই জ্ঞান অর্জন সম্ভব এবং এর থেকে চাইলে যেকোনো একটি শাখাতেও ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতিটি শাখারই বর্তমানে প্রচুর চাহিদা আছে আর এর চাহিদা যেমন বেশি তেমনি স্যালারিও প্রচুর

আমেরিকার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এর পর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার দের গড় বেতন সবচেয়ে বেশি। তবে তার মানে এই নয় যে সবাই উচ্চ বেতনের কোনো চাকরি পাবে, এজন্য সেই পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এটা শুধু পুরকৌশল নয়, সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

 

বাংলাদেশে ডুয়েট, বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট, সাস্ট, মিস্টসহ অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যেমন- এশিয়া প্যাসিফিক, আহসানুল্লাহ, আইইউবিএটি , ড্যাফোডিল, নর্থ সাউথ, সোনারগাঁও সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে গ্র‍্যাজুয়েশন করা যায়। আর উচ্চশিক্ষার জন্য তো বাইরের দেশে বিভিন্ন স্কলারশিপ এর ব্যবস্থা আছেই। 

 

পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, এলজিইডি, বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ সহ বিভিন্ন সেক্টরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত বিভাগ, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী বিদুৎতায়ন বোর্ড, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, মিলিটারী ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস,  ইউনিভার্সিটির ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন, বিভিন্ন বন্দর, ওয়াসা ইত্যাদিতেও কাজের বহূমুখী সুযোগ রয়েছে।  


Leave a Comment

error: Content is protected !!