মেটাভার্স: যে নতুন প্রযুক্তি চালু করতে যাচ্ছে ফেসবুক

মেটাভার্স: যে নতুন প্রযুক্তি চালু করতে যাচ্ছে ফেসবুক

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম শুনলেই সবার আগে যে মাধ্যমটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে তা হচ্ছে ফেসবুক। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং ব্যবহারকারীর দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যে অ্যাপটি সেটি ফেসবুক। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন অর্থাৎ ৩০০ কোটি মানুষ বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহার করছে। ২০০৪ সালে তৈরি করা এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ সম্প্রতি ‘মেটাভার্স কোম্পানি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার পরপরই মেটাভার্স শব্দটি সকলের মুখে যেন পরিচিত একটি শব্দ হয়ে উঠেছে। তবে কি এই মেটাভার্স? এর কাজই বা কি? কেন ফেসবুক এই নতুন প্রযুক্তি আনতে যাচ্ছে?

 

মেটাভার্স নিয়ে সর্বপ্রথম ধারণা দেয় আমেরিকান লেখক নিল স্টিফেনস। ২০১৭ সালে নিল স্টিফেনস ভ্যানিটি ফেয়ারের সাথে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নিজের একটি সায়েন্স ফিকশন বইয়ে তিনি প্রথম মেটাভার্স শব্দটি ব্যবহার করেন এবং কল্পবিজ্ঞানে এর ধারণা দেন। ১৯৯২ সালে লেখক নিলস স্টিফেনস তার স্নো ক্রোশ নামক সায়েন্স ফিকশন বইয়ে প্রথম মেটাভার্স নিয়ে আলোচনা করেন, যেখানে একজন মানুষ স্বশরীরের উপস্থিত না থেকেও মনে হবে তিনি সেখানে উপস্থিত আছেন। তার এ ধারণার পরপরই প্রযুক্তি দুনিয়ায় এই মেটাভার্স নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে যায়। তখনকার বিখ্যাত কিছু টেক জায়ান্ট কোম্পানি এই মেটাভার্স নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করার প্রস্তাবও দিয়ে দেন। তবে এই মেটাভার্স ধারণাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি দুনিয়ায় সাড়া ফেলে দেয় “গুগল আর্থ” অ্যাপ। এর প্রতিষ্ঠাতা জানায় নিল স্টিফেনস এর এই মেটাভার্স ধারণাকে কাজে লাগিয়েই তিনি গুগল আর্থ বানিয়েছিলেন। তবে এই মেটাভার্স আসলে কি? কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি?

 

মেটাভার্সকে সহজ কথায় বলতে গেলে ইন্টারনেটের পরের ধাপই বুঝায়। ইন্টারনেটে একজন মানুষ অন্য মানুষের সাথে স্বশরীরের উপস্থিত না থেকেই যোগাযোগ করতে পারছে, অফিসের কাজ করতে পারছে, গেইম খেলতে পারছে। কিন্তু মেটাভার্স প্রযুক্তিতে আপনি স্বশরীরের উপস্থিত না থেকেও মনে হবে আপনি সেখানে উপস্থিত আছেন, অর্থাৎ ভারচুয়াল রিয়েলিটির সাথে মিলিয়ে এই নতুন প্রযুক্তি আনা হচ্ছে। বাস্তবতার সাথে ডিজিটাল প্রযুক্তির নামই হচ্ছে মেটাভার্স। এখানে আপনি আপনার চেহারার অনুকরণ করে এভাটার বানাতে পারবেন যা আপনার হয়ে ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে সমস্ত কাজ করে থাকবে। ধরুন আপনি ঘরে হাঁটছেন তো এই প্রযুক্তির সাথে যুক্ত হলে আপনার এভাটারও আপনার মতোই ভার্চুয়াল জগতে হাঁটবে। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট ব্যবহার করে তারপরই করতে হবে। নয়তো এই প্রযুক্তি কোনোভাবেই কাজ করবে না। 

 

ফেসবুক এই মেটাভার্স প্রযুক্তি আনতে যাচ্ছে তাদের প্লাটফর্মগুলোকে আরও আধুনিক করে তোলার জন্য। মেটাভার্স কোম্পানি নামে ফেসবুক যে প্রতিষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়েছে সেখানে সবকিছুই তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে চলবে। ফেসবুকও মূলত তখন সেই প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ হিসেবে কাজ করবে। সেখানকার কন্টেন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম সবকিছুই এখনকার থেকে আলাদা হবে। বর্তমানে দেখা যায় আমরা ফেসবুকে যে ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখি সেগুলোতে মেটাভার্স প্রযুক্তি যুক্ত করার পর মনে হবে আমরাও সেই কন্টেন্টের ভিতরেই বসে আছি। ৩ডি মুভির মতো ভিআর গ্লাস পড়ে তখন এই কন্টেন্টগুলো দেখতে হবে। তখন একজন ব্যবহারকারীর মনে হবে তিনি নিজেও সেই কন্টেন্টটিতে আছেন, সেখানকার চরিত্রগুলোর সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন। ভি আর প্রযুক্তি ব্যবহার করে একজন ব্যবহারকারী তার পছন্দমতো কাজের পরিবেশ বানিয়ে নিতে পারবে, গেইম খেলার জন্য নিজের মতো করে সবকিছু সাজিয়ে নিতে পারবে। 

 

এখন যেমন আমরা সরাসরি দেখে একজনের সাথে ফোনে কথা বলতে পারি, এই মেটাভার্স প্রযুক্তি আনার পর মনে হবে আমরা একজন আরেকজনের পাশে বসেই সব কথা বলছি। এর জন্য ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করা শুরু করেছে ফেসবুক। ২০১৪ সালে ফেসবুক জনপ্রিয় ভিআর পণ্য নির্মাতা অকুলাস কিনে নিয়েছে। ২০১৯ সালে ফেসবুক হরাইজন সেবা নামে নতুন এক ভার্চুয়াল সেবা চালু করে যেখানে অকুলাস হেডসেট ব্যবহার করে কার্টুন এভাটারের মাধ্যমে কথা বলার বা মেলামেশার সুযোগ পাওয়া যায়।

 

তবে এই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের যেমন আগ্রহ কাজ করছে তেমনি নানা বিতর্কেরও সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মতে ফেসবুক এই নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসছে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। ভিআর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ভেরিটি ম্যাকিনটশ বলেছেন, ভিআর বা এআর প্রযুক্তিতে ফেসবুকের বড় বিনিয়োগের একটা বড় কারণ হলো ‘গ্রাহক ডাটা’। এসব প্লাটফর্ম থেকে সহজেই ব্যাপক ডাটা কালেক্ট করা যায় যা প্রযুক্তি দুনিয়ায় সোনার খনির মতো। 

 

Leave a Comment

error: Content is protected !!